কেন ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে’ মিশরকে চায়নি সৌদি

Tanjir Khan Rony | প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ২১:৩৯
কেন ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে’ মিশরকে চায়নি সৌদি

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মিলে ‘যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির মাধ্যম দেশ তিনটি প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি যেমন দিয়েছে, তেমনি এক দেশ আক্রান্ত হলে তা তিন দেশের ওপর হামলা বলে গণ্য হবে– এমন বন্দোবস্তও রেখেছে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তইয়্যব এরদোয়ান জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে বন্ধুত্বপূর্ণ অন্য দেশগুলোও এই ‘সুন্নি ন্যাটোর’ অংশ হতে পারবে। 


এ ক্ষেত্রে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির’ চতুর্থ দেশ হিসেবে জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছিল মিশরের নাম। দেশটি শিগগিরই এই চুক্তিতে যোগ দিতে পারে বলে জানিয়েছিল কিছু সূত্র।  


লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই অন্তত তিনটি সৌদি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, চুক্তিতে মিশরের অন্তর্ভুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সৌদি আরব।


সূত্রগুলোর একজন সৌদি রাজপরিবারের সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা। তিনি বলেছেন, রিয়াদ অন্তত ‘এই মুহূর্তে’ মিসরকে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়নি। তবে তিন সূত্রই নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সৌদি আরবের এই অবস্থানের পেছনে মূল কারণ হলো– প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সরকারের প্রতি রিয়াদের ক্রমবর্ধমান হতাশা। সৌদি নেতৃত্বের ধারণা, মিশরের এখন আর আগের মতো কৌশলগত বা সামরিক গুরুত্ব নেই।  


সূত্রগুলোর মতে, মিশরকে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করার সিদ্ধান্তের পেছনে রিয়াদ ও কায়রোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা উত্তেজনাই অন্যতম কারণ। তারা বলেন, ২০১৩ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সিসি ক্ষমতা দখলের পর তার সরকারকে সবচেয়ে বড় আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল সৌদি আরব। মিশরের দুর্বল অর্থনীতিকে সামাল দিতে রিয়াদ প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যুগুলোতে মিশরের কাছ থেকে সমপরিমাণ সমর্থন না পাওয়ায় সৌদি আরব এখন হতাশ। 


বিশেষ করে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সৌদি আরবের লড়াইয়ে মিশরকে পাশে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ সৌদি আরবের। একইভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের সময়ও মিশরের হতাশাজনক অবস্থানের কথা তুলে ধরেন তিনি।


সূত্রগুলো আরও জানান, মিশরের ক্রমেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের ছায়াতলে চলে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে রিয়াদ বেশ উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি আবুধাবির সমর্থন নিয়ে সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে সম্পর্কের অবনতির পর এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ওই গোষ্ঠীগুলোকে রিয়াদ তার জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।


দুই সূত্রের ভাষ্য, ইরানের হামলার জবাবে মিশর আবুধাবিতে যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালে সিসি একাধিকবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে দেখা করতে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু সৌদি আরবের ক্ষেত্রে একই ধরনের কোনও পদক্ষেপ দেখা যায়নি।


তাদের মতে, এর ফলে আবুধাবির সঙ্গে সিসির ঘনিষ্ঠতা নিয়ে রিয়াদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। রিয়াদ মনে করে, আমিরাতের বেশ কিছু নীতি মিসরের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থের বিরুদ্ধেও যাচ্ছে। 


এর মধ্যে রয়েছে- সোমালিল্যান্ডে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা, ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের কৌশলগত সম্পর্ক, গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম বা নীল নদের ওপর ইথিওপিয়ার বিশাল বাঁধ নিয়ে বিরোধে ইথিওপিয়ার প্রতি আমিরাতের সমর্থন এবং সুদানের র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) প্রতি তাদের সমর্থন।


এক সৌদি সূত্র বলেন, আবুধাবির সঙ্গে কায়রোর ঘনিষ্ঠতাই মূলত মিশরকে নিয়ে সৌদি আরবের মধ্যে অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।


সৌদি রাজপরিবারের সাবেক ওই জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা বলেন, ঐতিহাসিকভাবেই সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল মিশর, অথচ বিনিময়ে খুব সামান্যই দিয়েছে। 


তিনি বলেন, ‘মিসর সবসময় আমাদের, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল থেকেছে। তারা কিছু ফিরিয়ে দেয় না, শুধু নেয় আর নেয়, কোনও প্রতিদান নেই।

মন্তব্য করুন

Login to comment

আন্তর্জাতিক নিয়ে আরও পড়ুন

Global Before Footer