যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চূড়ান্ত চুক্তির পথে যেসব প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে
প্রায় চার মাসের দীর্ঘ সংঘাতের অবসান ঘটাতে সুইজারল্যান্ডে যখন মার্কিন ও ইরানি আলোচকরা শান্তি বৈঠকে বসছেন, তখন দুই পক্ষের সামনে অপেক্ষা করছে একগুচ্ছ কঠিন চ্যালেঞ্জ। বুধবার (১৭ জুন) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানি নেতাদের স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ বিশ্ব রাজনীতিতে কিছুটা আশা জাগালেও, ৬০ দিনের সংক্ষিপ্ত সময়সীমার মধ্যে চূড়ান্ত মীমাংসা সম্ভাবনা নিয়ে এখনও সন্দিহান বেশিরভাগ বিশ্লেষক।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অন্তর্বর্তীকালীন এই চুক্তিটি সবচেয়ে জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে আলোচনার পরবর্তী ধাপের জন্য জিইয়ে রেখেছে, যা যে-কোনো মুহূর্তে পুরো প্রক্রিয়াটিকে ভেস্তে দিতে পারে।
এই শান্তি প্রক্রিয়ার প্রধানতম বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ। ট্রাম্প প্রশাসন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ইরানের অঙ্গীকারের কথা প্রচার করলেও, তা মূলত তেহরানের পুরোনো প্রতিশ্রুতিরই পুনরাবৃত্তি। আসল সংকট তৈরি হবে ইরানের কাছে থাকা ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে। ট্রাম্প যেখানে এই উপাদানটি দেশের বাইরে পাঠানো বা ধ্বংস করার দাবিতে অনড়, ইরান সেখানে এর কোনোটিই করতে রাজি নয়; তারা বড়জোর এর মান কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।
এছাড়া ইরানের ভবিষ্যৎ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যে নামিয়ে আনার মার্কিন দাবির বিপরীতে ইরান তাদের অধিকার ছাড়তে নারাজ। অতীতে ৫ থেকে ২০ বছরের স্থগিতাদেশ নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। ওবামা আমলের ২০১৫ সালের চুক্তির মতো আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের মান ইরান এবার মেনে নেবে কি না, সেই প্রশ্নও রয়ে গেছে।
পারমাণবিক ইস্যুর পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়েও জটিলতা কম নয়। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর ইরান এই জলপথ কার্যকরভাবে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী শুক্রবার (১৯ জুন) প্রণালীটি খুলে দেওয়ার কথা থাকলেও জাহাজ মালিকরা এখনো সতর্ক রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র এই রুটটি সম্পূর্ণ টোলমুক্ত করার পক্ষে, অন্যদিকে যুদ্ধকালীন সময়ে প্রণালীটির নিয়ন্ত্রণ হাতে পেয়ে সুবিধা অর্জন করা ইরান এর ব্যবস্থাপনার ভূমিকা বজায় রাখতে জোর দিচ্ছে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ ছাড়ের বিষয়। ইরান দ্রুত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জব্দকৃত বিলিয়ন ডলারের তহবিল ফেরত চাইলেও, ওয়াশিংটন একে পর্যায়ক্রমিক এবং শর্তসাপেক্ষ রাখতে চায়। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি হিসেবে ইরান অবিলম্বে তেল বিক্রির ছাড় পাচ্ছে। ট্রাম্পও হয়তো ওবামা আমলের মতো ইরানকে সহজে অর্থ হস্তান্তরে রাজি হতে চাইবেন না।
এই দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির বাইরে সবচেয়ে বড় অদৃশ্য বাধা হিসেবে কাজ করছে ইসরায়েল ফ্যাক্টর। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে ইসরায়েল কোনো মার্কিন-ইরান চুক্তি মানতে বাধ্য নয়।
ট্রাম্পের তিরস্কারের পর সাময়িকভাবে লেবাননে সংঘাত কমলেও নতুন করে উত্তেজনা পুরো আলোচনাকে হুমকির মুখে ফেলবে, যদিও ইরান বলছে এই চুক্তিতে লেবাননে যুদ্ধবিরতিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর পাশাপাশি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের সাথে ইরানি আলোচকদের ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতির সমন্বয় সাধন করা কঠিন হতে পারে।
ট্রাম্প যেখানে দ্রুত ফলাফল চান, মার্কিন প্রতিনিধি দলের বিপরীতে ইরানি পোড়খাওয়া আলোচকরা আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে পছন্দ করেন। ওবামার চুক্তি চূড়ান্ত হতে যেখানে দুই বছর লেগেছিল, সেখানে ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া ৬০ দিন খুবই কম এবং গাজায় ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি থমকে থাকার ইতিহাস এই চুক্তির বাস্তবায়নকেও সন্দিহান করে তোলে।
দুই দেশের মধ্যকার গভীর অবিশ্বাস এই শান্তি প্রক্রিয়াকে যেকোনো সময় ব্যর্থ করে দিতে পারে। গত এক বছরে আলোচনার মাঝেই দুইবার মার্কিন হামলার কারণে ইরান ট্রাম্পকে গভীরভাবে সন্দেহ করে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের কৌশল নিয়ে সন্দিহান থাকবে। যদি ট্রাম্প ইরানকে ছাড় দিতে অস্বীকার করেন, কিংবা ইরানের অভ্যন্তরীণ চাপ আলোচকদের অনমনীয় হতে বাধ্য করে, অথবা সমঝোতা স্মারকের পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যা অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি করে, তবে যেকোনো মুহূর্তে আলোচনা ভেঙে যেতে পারে।
এমনকি সংঘাত চলাকালীন ট্রাম্পের স্বভাবসুলভ কঠোর হুমকিও ইরানকে আলোচনার টেবিল থেকে সরিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আর যদি তারা চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে সীমিত চুক্তি বা আলোচনার সময়সীমা বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে আরও বড় সংঘাত শুরু হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।